সাংবাদিক হিসেবে পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ প্রদত্ত বিশেষ নিরাপত্তা পাস দেওয়া হয়েছিল।
শামস শামীম ::
২০০১ সাল। রাজনীতিবিদরা চষে বেড়াচ্ছেন ভোটের মাঠ। মাস খানেক আগে সুনামগঞ্জ বালুর মাঠে নির্বাচনী সমাবেশ করতে আসেন বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়া। সম্ভাব্য প্রার্থীরা জমায়েত বাড়াতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেন। সমাবেশের স্থান নির্ধারণ হয় সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাইস্কুল মাঠ - তথা বালুর মাঠে। ওই সমাবেশেই শেষ বিকেলের কোমল আলোয় আমি একরঙা শাড়িতে ক্লান্তিহীন নিরাভরণ এক বাঙালি নারীকে কাছে থেকে দেখার প্রথম সুযোগ পাই। মঞ্চটা ছিল দক্ষিণমুখী। তবে পশ্চিমের খোলা প্রান্তর থেকে দখিনা হাওয়া ছুটে আসতে কোনও বাধা ছিলনা। শেষ বিকেলের আলো এসে টুপ করে পড়েছিল সলাজ বেগম খালেদা জিয়ার মঞ্চে। স্বর্গীয় দ্যুতি ছড়াচ্ছিল তার অবয়বে। সামনে হাজার হাজার জনতা বক্তব্য শুনতে জড়ো হয়েছিলেন।
আমি তখন সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ছাত্র। সাপ্তাহিক সুনামকণ্ঠের সঙ্গে যুক্ত। নির্বাচনী সমাবেশ হলেও বেগম খালেদা জিয়া তখন ক্ষমতায় না থাকায় নিরাপত্তা নিয়ে কড়াকাড়ি বা জোরজবরদস্তি ছিলনা। তখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতিও এখনকার মতো উত্তাল ও সহিংস ছিলনা। মঞ্চের কয়েক ফুট সামনে বাঁশ দিয়ে বেড়া দেওয়া হয় যাতে মঞ্চ ঘেঁষে কেউ দাঁড়াতে না পারে।
আজকের দৈনিক সুনামকণ্ঠ তখন সাপ্তাহিক ছিল। আমাদের সম্পাদক বিজন দা একটি নোট ও একটি শাদাকালো রিলের ক্যামেরা দিয়েছিলেন সমাবেশের ছবি তোলার জন্য। আমি একেবারে ক্যামেরা নিয়ে সামনে চলে চাই। প্রধান অতিথির বক্তব্যের আগে বেগম খালেদা জিয়া দলীয় প্রার্থী অ্যাডভোকেট ফজলুল হক আছপিয়া, নজির হোসেন, কলিম উদ্দিন আহমদ মিলন, নাছির উদ্দিন চৌধুরী এবং চারদলীয় জোট প্রার্থী মাওলানা শাহিনুর পাশাকে পরিচয় করিয়েছিলেন।
সভায় সুনামগঞ্জ শহরের একটি বিশিষ্ট পরিবারের রাজনৈতিক ডিগবাজির বিরুদ্ধেও তিনি কথা বলেন। তিনি হাত তুলে প্রার্থীদের হাত ধরে উপস্থিতিদের সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন। উন্নয়ন ও অগ্রযাত্রার জন্য ধানের শীষে ভোট দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন।
আমি সভার প্রচুর ছবি তুলি। আমার গায়ে ছিল শাদা হাফ হাতার গেঞ্জি ও জিন্সের কালো প্যান্ট। তখন এতো সাংবাদিকের ছড়াছড়িও ছিলনা। সিনিয়র সাংবাদিকরা নীরবে বসে ছিলেন চেয়ারে। ক্যামেরা সাংবাদিক নয় বিভিন্ন স্টুডিওর ফটোগ্রাফারদের ছবি তোলার জন্য নিয়ে আসতেন সিনিয়র সাংবাদিকরা। মঞ্চে যারা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ আমি তাদের কাউকে চিনিনা। তারাও আমাকে চিনেননা। একজন উঠতি তরুণ হিসেবে আমি সেদিন প্রথম জাতীয় কোনও প্রভাবশালী নেতার জনসভা কাভার করেছিলাম কোনও অভিজ্ঞতা ছাড়াই। যে কারণে ওই সভাটি আমার স্মৃতিতে এখনো প্রোজ্জ্বল হয়ে আছে।
অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার সাথে সাথে দ্রুত চলে আসি পৌর মার্কেটের অফিসে। বিজন দা ক্যামেররা রিলটি নেগেটিভ করে দেওয়ার জন্য ‘সফেদা ফটো স্টুডিও’তে পাঠিয়ে দেন। আমি যতটুকু বক্তব্যের নোট ততটুকুই লিখে দেই। পরে শাহার উদ্দিন আঙ্কেল নিউজটির মূল সুর ধরে সম্পাদনা করে পত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। সমাবেশটি কাভার করার জন্য আমার কোনও অভিজ্ঞতা ছিলনা। তবে নতুন হিসেবে উত্তেজনা ছিল। তাই বারবার ছবি তোলার জন্য অবস্থার পরিবর্তন করছিলাম। এটি ভালো নজরে নেননি মঞ্চে থাকা স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। কিন্তু মঞ্চ আলোকিত করে বসা বেগম খালেদা জিয়ার কারণে আমাকে কেউ ধমকও দেননি হয়তো। এই প্রচ্ছন্ন উৎসাহে আমি পটাপট বহু ছবি তুলেছিলাম এবং নোটও নিয়েছিলাম মূল বক্তব্যের। এটাই ছিল বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রযাত্রার অন্যতম প্রধান নেতা ও বাংলার প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কাছে থেকে, হাতে ছোঁয়া দূরত্ব থেকে প্রথম দেখার অভিজ্ঞতা। এর বহু পরে আমার মনে হয়েছে যদি সেদিন আমাকে মঞ্চের কাছে যেতে দেওয়া না হতো বা মঞ্চের লোকজন ধমকাতো তাহলে হয়তো সাংবাদিকতার উৎসাহটাই মিইয়ে যেতো। এই লাইনে আসা হতোনা আমার।
দ্বিতীয়বার বেগম খালেদা জিয়াকে সরাসরি দেখার সুযোগ পাই তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হতে চলছে। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধান হিসেবে কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল ছাতক জনসভায়। আমি তখন দেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সুনামগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি। মূলধারার ও তখনকার বাজারের প্রভাবশালী পত্রিকার প্রতিনিধি হিসেবে রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সুধীমহলের সঙ্গে আমার জানাশোনার দরোজাটা খুলে গিয়েছিল। বিএনপি নেতা প্রয়াত হুমায়ূন কবির জাহানূর ভাই, তৎকালীন ছাত্রদলের সভাপতি এটিএম হেলাল ভাই, আকবর আলী ভাইসহ অনেক নেতা আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন।
বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের শেষ দিকে নির্বাচনের আগে যখন ছাতকে আসেন তখন আমি সুনামগঞ্জ সরকারি কলেজের ডিগ্রি তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। তবে যায়যায়দিনের মতো পত্রিকায় কাজ করার সুবাদে ছোট বড়ো সব অনুষ্ঠানেই আমন্ত্রণ পেতাম। রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের ওই সমাবেশে সরকারের বিভিন্ন বাহিনী সমাবেশের আগেই সুনামগঞ্জে নিরাপত্তা ব্যবস্থা দেখতে আসেন। সাজ সাজ রব পড়ে যায়। নেতাকর্মীদের তৎপরতা ও উৎসাহও বেড়ে যায়। সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে সম্ভাব্য প্রাথীরা ব্যানার ও তোরণ নির্মাণ করেন। অনুষ্ঠানে নাম দেওয়ার জন্য, প্রস্তুতি নিয়ে লেখার জন্য অনেক শীর্ষ নেতাই করেছিলেন বিশেষ অনুরোধ। ছাতক পৌর শহরে বেগম খালেদা জিয়ার ওই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০০৬ সালের ২৩ আগস্ট। পুলিশ সুপার কার্যালয়ের জেলা স্পেশাল ব্রাঞ্চ ২৭৬ নম্বর ক্রমিক নম্বরে আমাকে বিশেষ নিরাপত্তা পাস প্রদান করা হয়। দ্বিতীয়বার ক্ষমতাসীন দলের তখনকার প্রধানমন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব বেগম খালেদা জিয়াকে কাছে থেকে দেখার ও অনুষ্ঠান কাভার করার সুযোগ পাই। প্রয়াত সাংবাদিক সাজু ভাই, আজিজুল ইসলাম চৌধুরী, আইনুল ইসলাম বাবলু, পঙ্কজ দা, প্রবাসী সাংবাদিক শাকির হোসাইন ও মাইদুল রাসেল, মাহমুদুর রহমান তারকেসহ সাংবাদিকদের একটি অংশ একই গাড়িতে গিয়েছিলাম। তখন ফোন-ফ্যাক্সের যোগ। এ-ফোর সাইজের সাদা অফসেট পেপারে হাতে লিখে নিউজ করতাম আমরা। আমি এবারও একেবারে মঞ্চের সামনে বাঁশের বেড়া ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছি। তবে কঠোর নিরাপত্তা ছিল। প্রথম বারের সমাবেশ কাভারের মতো হাতে ক্যামেরা ছিলনা। যায়যায়দিনের প্যাড ছিল। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া যখন বক্তব্য দিতে শুরু করেন পুরো মাঠ জেগে ওঠে। নেতাকর্মীরা স্লোগান দিতে থাকেন। তিনি বক্তব্য দেওয়ার পরপরই আমি নোট নিতে শুরু করি। প্রায় ২৩-২৪ মিনিটের মতো কথা বলেন। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা, হাওরে অবকাঠামো উন্নয়নের কথা, নারীর অগ্রযাত্রার কথা তুলে ধরেছিলেন। সমাবেশস্থলে আসার আগে আজকের ছাতক সুরমা সেতুর উদ্বোধন করেছিলেন তিনি। সুনামগঞ্জের উত্তর পূর্বাঞ্চলকে সহজ যোগাযোগের আওতায় নিয়ে আসতে এই সেতুর গুরুত্ব তখনই বুঝা গিয়েছিল। যার ফল ভোগ করছেন এখন এলাকাবাসী। পরবর্তীতে তার সরকার সুনামগঞ্জ শহরে সুরমা সেতুরও উদ্বোধন করেছিল। এই দুটি সেতু স্বাধীনতার পর সুনামগঞ্জের যোগাযোগ অবকাঠামোর প্রশস্ত ও স্থায়ী দরোজা খুলে দিয়েছিল। যার সুফল ভোগ করছেন সবাই। ওই দিন ছাতকে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অনুষ্ঠান সম্পন্ন করে ছাতকের সাংবাদিকদের অফিসে বসে আমি দ্রুত নিউজটি হাতে লিখে ফ্যাক্সযোগে ঢাকায় পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। সমাবেশ কাভার করতে তখন যায়যায়দিনের ব্যুরো প্রধান পার্থ সারথী দাস দাদাও এসেছিলেন। পরদিন প্রথম পাতায় নিউজটি ছাপা হয়েছিল। আমি দ্রুত নিউজ লিখে ফ্যাক্স করে দেওয়ায় সাজু ভাই ও আজিজুল চাচা বিস্মিত হয়েছিলেন। পরে আমার নিউজের কপিটি আজিজুল চাচা নিয়েছিলেন। সাজু ভাই ও আজিজুল চাচা দুজনই এখন স্মৃতি।
আমার প্রথম যৌবনের এই দুই খন্ডিত স্মৃতিই বেগম খালেদা জিয়াকে কাছে থেকে দেখার এবং সাংবাদিক হিসেবে তার সমাবেশ কাভার করার অমূল্য অভিজ্ঞতা। শীর্ষ নেতৃত্বের কোনো বক্তব্য থেকে কীভাবে পয়েন্ট বের করে আনতে হয় এই হাতে-কলমে শিক্ষা আমি পেয়েছিলাম এই দুটি বড় সমাবেশ থেকেই।
দুটি অনুষ্ঠানের বক্তব্যের কথা যতটুকু মনে আছে তখন সাবলীল ভাষায় ছোট ছোট বাক্যে গাঁথা উন্নয়ন ও সম্ভাবনা নিয়ে। তাঁর বক্তব্যে প্রতিপক্ষকে নোংরাভাবে বিদ্ধ করার প্রবণতা ছিলনা। এখনকার পরিস্থিতির মতো নেতাদের আগ্রাসী বক্তব্যের ধারেকাছেও ছিলেন না তিনি। নেতাদের লাগামহীন বক্তব্যে কর্মীরা উত্তেজিত হয়ে মবসন্ত্রাস চালাবে এসব ছিল কল্পনাতীত। তিনি গঠনমূলক সমালোচনা করেছিলেন প্রতিপক্ষের। লাখো জনতার হাততালি ও স্লোগানে তাকে অভিনন্দিত করছিল। বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ছিল তাঁর কণ্ঠে। সবার আগে বাংলাদেশের সম্মান ও মর্যাদা সমুন্নত রাখার কথা বলেছিলেন। নিজেদের রাজনৈতিক জোটসঙ্গীরা নারীদের প্রতি অন্যচোখা থাকলেও নারীদের অগ্রযাত্রার কথা বলেছিলেন উচ্চকণ্ঠে।
একটি প্রান্তিক জেলায় যখন নারীরা এসব সভা সমাবেশ প্রায় এড়িয়ে চলতেন তখন বিপুল নারীরা ছুটে এসেছিলেন তাঁর ডাকে। তাঁর কথা শুনেছিলেন তন্ময় হয়ে। বাংলাদেশে শুধু গণতান্ত্রিক আন্দোলনই নয় নারীজাগরণ ও নারীর ক্ষমতায়নের এক বিশাল বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। হাওরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন তথা যোগাযোগ উন্নয়নের উৎসমুখ খুলে দিয়েছিলেন তিনি। গৃহবধূ থেকে দেশ ও আন্তঃদেশে প্রভাবশালী রাজনীতিবিদ রূপে নিজেকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসে তিনি চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ইতিহাসের স্বর্ণাভ অক্ষরে লেখা থাকবে তাঁর বিশেষ অবদান।
[লেখক: সভাপতি, সুনামগঞ্জ রিপোর্টার্স ইউনিটি।]
নিউজটি আপডেট করেছেন : SunamKantha
সাংবাদিক হিসেবে বেগম খালেদা জিয়াকে কাছে থেকে দেখার দুই টুকরো স্মৃতি
- আপলোড সময় : ০১-০১-২০২৬ ০৯:০৬:৩২ পূর্বাহ্ন
- আপডেট সময় : ০১-০১-২০২৬ ১১:৫৭:৩৭ পূর্বাহ্ন
ছবি: লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী শামস শামীম ও সংযুক্তি বিশেষ নিরাপত্তা পাস কার্ড
কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ

স্টাফ রিপোর্টার, দৈনিক সুনামকণ্ঠ